এক

যতদূর মনে পরে মিসির আলির সাথে আমার পরিচয় ক্লাস সিক্সে। একদিন সকালে ভাইয়ার পড়ার টেবিলে হুয়ায়ূন আহমেদের একটি বই পাই। গল্পের বই পেলে তা না পড়া পর্যন্ত আমার পেটের ভাত হজম হয় না। তাই ভাত হজম করার জন‍্য বইটা তখনই পড়া শুরু করি। পড়তে পড়তে দেখি মিসির আলি নামে একজন রয়েছে বইটিতে। 

বই পড়ে আমি অবাক, কি চমৎকারভাবেই মানুষটি নানা ঘটনা বিশ্লেষণ করছেন। সাধারণ ঘটনাকে এভাবে চিন্তা করা যায় আমার ধারণা ছিল না সেই সময়। তখন থেকেই মিসির আলি চরিত্রের প্রতি মায়া ও ভালোবাসা জাগা শুরু হল। মনে মনে ভাবতাম বড় হয়ে আমি মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়ব। তারপর মিসির আলির মত সবার নানা সমস‍্যার সমাধান দিব।

বই পড়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, বইয়ের চরিত্রগুলোকে নিজের মত করে কল্পনা করা যায়। নিজের কল্পনায় থাকা চরিত্রের আকার আকৃতি একান্ত নিজের থাকে। নিজের মত করে সেই কল্পনাটিকে সাজিয়ে নেয়া যায়। যা নাটক বা মুভিতে সম্ভব নয়।

মিসির আলির সেরকম একটি চরিত্র আমার কল্পনায় জায়গা করে নেয়। আমি বলে বা লিখে এই চরিত্রের আকার আকৃতি কিংবা কল্পনা সম্পর্কে বুঝাতে পারব না। তবে এটা বলব, আমার কল্পণার মিসির আলিকে ধ্বংস হয়েছে ‘দেবী’ মুভি দেখার পরে।  এখন মিসির আলির কোন বই পড়লে আমার কল্পনার চরিত্রটা না এসে চঞ্চল চৌধুরির চেহারা ভেসে উঠবে।

দুই 

দেবী মুভি নিয়ে আমার আগ্রহের এক মাত্র কারণ ছিল মিসির আলি। আমার কল্পনার থাকা মিসির আলিকে বড় পর্দায় কেমন লাগবে তা দেখার জন‍্য অপেক্ষা করছিলাম। শুক্রবার মুভিটি মুক্তি পেলেও সেদিন অন‍্য কাজ থাকায় দেখতে যেতে পারিনি। তারপর দিন গুনছিলাম কবে দেখতে যাব। অবশেষে একদিন সকালে এক দেবীকে সাথে নিয়ে চলে গেলাম ‘দেবী’ দেখতে। 

বইয়ে সাথে মুভির সব মিলবে না এটা মাথায় নিয়ে গিয়েছিলাম হলে। চিত্রনাট‍্যের প্রয়োজনের হয়ত মূল বইয়ের সাথে মুভির কাহীনির পার্থক‍্য ১৯-২০ হতে পারে। যেমনটা হয়েছিল, আমার বন্ধু রাশেদ মুভিতে। 

দেবী বইয়ের শুরুতে ছিল, মাঝ রাতে রানুর ঘুম ভেঙ্গে যায়। তার মনে হল ছাদে যে কেন হাঁটছে। সাধারণ মানুষের মত হাঁটা নয়। পা টেনে টেনে হাঁটা। রানু ভয়ার্ত গলায় ডাকলো, এই আনিস এই…. 

বইয়ের মতই দেবী মুভির শুরুটা এমন হবে আমি ভেবিছলাম। কিন্তু না, শুরু হল একটা শিশুকে বলি দেয়া হচ্ছে এমন দৃশ‍্য দিয়ে। এই দৃশ‍্যটুকু দেখে মনে হল, হরর মুভি ফিল দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে পরিচালকের এই চেষ্টা মন্দ লাগেনি।সিনেমাটোগ্রাফি দারুণ ছিল। 

মূল গল্প অনুযায়ী রানুর বয়স ১৭-১৮ বছর। এই রানু চরিত্রে জয়াকে দেখে অবাক হয়েছি আমি। বড় পর্দায় জয়াকে দেখেই মনে হয়েছে আসলেই তার বয়স কম। চমৎকার অভিনয়ে রানু চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে সে। রানু যখন তার স্বামী আনিসের সাথে কথা বলছিল তখন ঠিক একজন কিশোরীই মনে হয়েছিল জয়াকে। 

নীলু চরিত্রে শবনম ফারিয়া চমৎকার অভিনয় করেছে। আমার কল্পনায় থাকা নীলুর মতই ছিল কিছুটা। কম কথা বলা, নতুন কারো সাথে পরিচয়ের সময় নার্ভাস ফিল করা এবং গায়ের রঙ নিয়ে নিজের মধ‍্যে হীনমন্যতা থাকায় অনুভূতিগুলো নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছে ফারিয়া।  

DEBI-MOVIE-HALL-TUSIN

মূল বইয়ে ছিল, একজন অপরিচিত মানুষের সাথে নীলুর চিঠির মাধ‍্যমে পরিচয় হয়। বইয়ে কত সুন্দর করে চিঠির কাহিনীগুলো উঠে এসেছিল। কিন্তু দেবীতে মুভিতে চিঠির বদলে হাজির করা হল ফেইসবুকে। নীলুর সাথে অচেনা মানুষের পরিচয় হয় ফেইসবুকে। যা আমার প্রচন্ড বাজে লেগেছে। মূল গল্প থেকে এত পার্থক‍্য আমি আশা করেনি। চিঠিতে অনুভূতিগুলো যেভাবে তুলে ধরা সম্ভব তা ফেইসবুক ম‍্যাসেজে সম্ভব নয়। আমি বুঝলাম না চিঠি অংশটুকু রাখলে কি এমন ক্ষতি হতো? এই কাজটি করতে গিয়ে মুভি মূল‍ আকর্ষণই কমিয়ে ফেলা হয়েছে।

এরপর, আমার কাছে মনে হয়েছে এই মুভিটিতে মিসির আলি কেন্দ্রিক নয় বরং রানু কেন্দ্রিক। মিসির আলির আবেগটুকু এতে ফুটিয়ে তুলবে ব‍্যর্থ পরিচালক। তবে এক্ষেত্রে চঞ্চল চৌধুরি কোন দোষ নেই। ওনি চমৎকার অভিনয় করেছে। রানুর দৃশ‍্য বেশি দেখাতে গিয়ে পুরো মুভিতে মিসির আলিকেই যেন ঠিকভাবে তুলে ধরেনি। কেমন যেন ছন্নছাড়া মনে হয়েছে আমার কাছে।

মুভির শেষ পার্টটুকু হয়েছে আরো হাস‍্যকর। হরর ফিল দিতে গিয়ে খিচুরী বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

তিন

এই পুরো মুভিটা দেখতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদকে প্রচন্ড মিস করেছি। এই মুভি যদি ওনি বানাতেন তাহলে কত না সুন্দর হতো। আর মুভিটি দেখার পরে ওনা কি অনুভূতি হত? ওনি কি খুশি হতো? নাকি মুভিটি দেখা শেষ বলতো, ফাযিল। আমার গল্পটাকে এভাবে গলা টিপে হত‍্যা করার অধিকার যে দিসে? ১০ বার কানে ধরে উঠবস কর। 

 

 

বন্ধুদের জানিয়ে দেন

আপনার মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here