এম জে ফেরদৌস, তথ্যপ্রযুক্তি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ব্রেইনস্টেশন২৩ লিমিটেডের প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা (সিওও)। আগে চাকরি করেছেন মাইক্রোসফটে। সম্প্রতি টেকশহরের ডটকমের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তার কর্মময় জীবন ও ব্রেইনস্টেশন২৩ লিমিটেড নিয়ে কথা বলেছেন টেকশহরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তুসিন আহমেদ

তুসিন আহমেদ :  ব্রেনস্টেশন২৩ এ যোগ দিয়েছিলেন কবে, কিভাবে? 

এম জে ফেরদৌস : ২০০৯ সালে ইতালি থেকে ৬ মাসের ছুটিতে দেশে আসি। ইতালিতে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে মাইক্রোসফট ডটনেট ও শেয়ারপয়েন্ট ডেভেলপার হিসেবে চাকরি শুরু করি। সেই সময় দেশে মাইক্রোসফটের কনটেন্ট ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার শেয়ারপয়েন্ট নিয়ে খুব কম ডেভেলপার কাজ করতো। প্লাটফর্মটি নিয়ে ধারণা থাকায় দেশের মাইক্রোসফট কমিনিউটির একটি ইভেন্টে স্পিকার হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে আমি শেয়ারপয়েন্ট সম্পর্কে বক্তব্য দেই।

ইভেন্টটিতে ব্রেনস্টেশন২৩ এর একজন পরিচালক ছিলেন। তিনিই আমাকে তাদের প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবার অফার দেন। তখন আমি ইতালিতে না গিয়ে কোম্পানিটিতে শেয়ারপয়েন্ট আর্কিটেক্ট হিসেবে যোগ দেই। সাড়ে চার বছরের মত কাজের পর মাইক্রোসফট বাংলাদেশ আমাকে অফার করলে মাইক্রোসফটে কাজ শুরু করি।

তুসিন আহমেদ : মাঝে ব্রেনস্টেশন ছেড়ে মাইক্রোসফটে, সেখান থেকে আবার কিভাবে ব্রেনস্টেশনে যু্ক্ত হলেন? 

এম জে ফেরদৌস : মাইক্রোসফটে থাকাকালে ব্রেনস্টেশনের পরিচালকদের সঙ্গে প্রায়ই যোগাযোগ হতো। কীভাবে স্থানীয় বাজারকে এগিয়ে নেয়া যায় তা নিয়ে নানা আলোচনা হতো। মাইক্রোসফটে কাজের ফলে স্থানীয় বাজার নিয়ে আমার মোটামুটি ভালো ধারণা তৈরি হয়েছে ততদিনে। ব্রেনস্টেশনে দীর্ঘদিন কাজ করেছি তাই চেষ্টা করতাম প্রতিষ্ঠানটি যেন আরো এগিয়ে যায়। তাই আমি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের সাধ্যমত নানা পরামর্শ দিতাম। কিন্তু লোকবল না থাকায় ওনার পরামর্শগুলো কাজে লাগতো পারতেন না। একটা সময় আমাকে অফার দিল প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যবসায়িক অংশীদার হওয়ার। যা আমি কখনো চিন্তা করিনি। অফার পাওয়ার পরে বেশ ভালো  লাগছিল। তখন আমি কিছুদিন সময় নিলাম চিন্তা করার জন্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজের একটি উদ্যোগ বা প্রতিষ্ঠান হবে এমন স্বপ্ন দেখতাম। এতদিন পরে নতুন কোম্পানি না খুললে তা এগিয়ে নিতে বেশ সময় সাপেক্ষ কাজ হবে। তাই ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও ব্র্যান্ড কোম্পানিতে অংশীদার হয়ে কাজ করলে মন্দ হয় না। একইসঙ্গে কোম্পানিকে দ্রুত এগিয়ে নেয়া যাবে। সেই চিন্তা থেকে আমি সিন্ধান্ত নেই মাইক্রোসফট ছেড়ে ব্রেনস্টেশনে জয়েন করার।

তুসিন আহমেদ :  কম্পিউটার বা প্রযুক্তির প্রতি ভালো লাগাটা কিভাবে এলো?

এম জে ফেরদৌস : সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় থেকে দেশে কম্পিউটারের প্রচলন বাড়তে শুরু করে। সেই সময় বিভিন্ন এলাকাতে ‘সাইবার ক্যাফে’ ছিল। সেখানেই ঘণ্টা প্রতি কম্পিউটার ব্যবহার করে কম্পিউটার শেখার শুরু। এলাকায় থাকা এমন একটি ক্যাফেতে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড কোর্সে ভর্তি হই। তখন থেকেই কম্পিউটারের হাতেখড়ি।

সেই সময় ‘ডিএক্স বল’ নামে একটি গেইম খেলেছিলাম। যা ছিল জীবনে প্রথম কম্পিউটার প্রথম গেইম খেলা। গেইমটি এতটাই ভালো লাগে যে তখন মনে মনে ঠিক করেছিলাম কম্পিউটার নিয়ে কিছু একটা করব। কী করব বা কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে যে পড়ালেখা করা যায় তাও জানতাম না। কিন্তু কম্পিউটার নিয়ে কাজ করার প্রচণ্ড ইচ্ছা তখনই তৈরি হয়।

টেকশহর : আপনার ক্যারিয়ার শুরু কিভাবে? 

তুসিন আহমেদ : বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে বিভিন্ন কোম্পানিতে চাকরির আবেদন করি। প্রথম দিকে চাকরি না পেয়ে হতাশ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনাল রেজাল্টের ২১ দিনের পর একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে চাকরি পাই। কোম্পানিটি মূলত এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি) সফটওয়্যার তৈরি করে। খোনে বেশ কিছুদিন কাজের পরে ট্যুরিজম  নিয়ে কাজ করে এমন আরেকটি কোম্পানিতে জয়েন করি সফটওয়্যার ডেভেলপার হিসেবে। তারপর সেখানে টিম লিড হিসেবে প্রমোশন পাই। পরবর্তীতে চাকরি ছেড়ে উচ্চতর পড়াশোনা করতে ইতালিতে যাই।

টেকশহর : ইতালিতে কী বিষয় নিয়ে পড়তেন, সেখানকার জীবন কেমন ছিল?

তুসিন আহমেদ : স্কলারশিপ নিয়ে ইতালিতে গিয়েছিলাম, তাই পড়াশোনায় তেমন খরচ বহন করতে হয়নি। তবে তার শর্ত ছিল রেজাল্ট ভালো থাকতে হবে। তাই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলাম প্রথম বর্ষে। যেন দ্বিতীয় বর্ষেও বৃত্তিতে কোনো ঝামেলা না হয়।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম সেখানে ক্লাসে উপস্থিত না থাকলে কোন অসুবিধা হতো না। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলটাই ছিল প্রধান বিষয়। এমন হয়েছে কোন পরীক্ষার আগে আমার প্রিপারেশন খারাপ থাকায় সেই পরীক্ষা দেয়নি। কয়েক সপ্তাহে পরে সেই পরীক্ষা দিয়েছিলাম।

দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় আমি পার্টটাইম চাকরির জন্য কয়েকটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে আবেদন করি। ভালো ইংরেজি ভাষা জানার পরেও ইতালিয়ান ভাষা না জানার কারণে চাকরি হয়নি। তবে অনেক চেষ্টার পরে থিসিস ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ মিলে একটি আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার কোম্পানিতে। সেখানে আমি বেশ কিছুদিন কাজের পরে আরেকটি কোম্পানি জয়েন করে এএসপি ডটনেট ও মাইক্রোসফট শেয়ারপয়েন্ট ডেভেলপার হিসেবে। সেখানে এক বছরের মত কাজ করি।

তুসিন আহমেদ : মাইক্রোসফটে চাকরি কিভাবে পেলেন, সেখানকার অভিজ্ঞতা কেমন?

এম জে ফেরদৌস : ব্রেনস্টেশনে থাকাকালে মাইক্রোসফটের অনেক কমিনিউটি ইভেন্টের আয়োজন করেছিলাম। সেই সময় মাইক্রোসফট বাংলাদেশ এমন একজনকে খুঁজছিলে যে কিনা শেয়ার পয়েন্ট টুলস সম্পর্কে ভালো জানেন। তারপর মাইক্রোসফট আমাকে তাদের সেই কাজের জন্য অফার করে। প্রথমে মাইক্রোসফটে সল্যুশন স্পেশালিস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। মাইক্রোসফটের এন্টারপ্রাইস বিজনেসকে আরো বিস্তৃত করার জন্য বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ-এশীয় মার্কেটে কাজ করতে হত। তারপর টেকনিক্যাল লিড হিসেবে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানসহ মোট চার দেশের দায়িত্ব পেয়েছিলাম।

মাইক্রোসফটে চাকরি পাওয়ার আগে আমি টেকনিক্যাল লোক ছিলাম। ব্যবসা বা পণ্যের প্রচারণা সম্পর্কে ধারণা কম ছিল। তবে মাইক্রোসফটে এসে আমি ব্যবসায়িক বিষয় সম্পর্কে জানতে পারি।

টেকশহর : দীর্ঘদিন ডেভেলপার বা কোর প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন, পরে সেলস ও বিজনেস টিমে কাজ করেছেন। দুই ধরনের কাজের মধ্যে নিশ্চই বড় পার্থক্য রয়েছে…

তুসিন আহমেদ : দেখুন, একটি একেবারে প্রযুক্তিদ আরেকটি ব্যবসায়িক দিক। অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে। তবে দুটি কাজের মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পেয়েছি। তবে মাইক্রোসফটে যোগ দেবার পর সেলস বিভাগে কাজ করলেও প্রযুক্তি নিয়েই কাজ করেছি সবসময়। এছাড়া অনলাইনে বিভিন্ন বিষয় শিখতাম নিয়মিত। এছাড়া মাইক্রোসফটে বিভিন্ন ট্রেনিংয়ে অংশ নিতাম। ফলে প্রযুক্তি চর্চাটা কমে গেলেও একভাবে থেমে যায়নি।

যেহেতু আমার ইচ্ছা ব্যবসা করার। তাই বর্তমানে আমি ব্যবসায়িক দিকটাতে বেশি নজর দিতে হচ্ছে।এছাড়া আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে কম্পিউটার বিভাগে অতিথি শিক্ষক হিসেবে পার্টটাইম ক্লাসও নিই। ফলে প্রযুক্তির বিভিন্ন দিক সর্ম্পকে আমার আপডেট থাকতে হয় নিয়মিত।

তুসিন আহমেদ : বেশকিছু প্লাটফর্ম থাকলেও মাইক্রোসফটকে কেন বেছে নিয়েছিলেন?

এম জে ফেরদৌস : বেশিরভাগ সময় এএসপি ডটনেট এবং মাইক্রোসফটের বিভিন্ন প্লাটর্ফম নিয়ে কাজ করেছি। কিছু সময় আমি পাইথন এবং জাভা নিয়ে কাজ করেছি।মাইক্রোসফট নিয়ে কাজ করার কারণ, যদি একটি প্লাটফর্ম নিয়ে কাজ করি এবং যদি সেটাতে দক্ষ হই তাহলে সেটার ভ্যালু অনেক বেশি হবে। একই সময়ে বিভিন্ন প্লাটফর্মে কাজ করতে গেলে নির্দিষ্ট একটাতে বিশেষ দক্ষ হওয়া যায় না। তাই আমি একটা প্লাটফর্মেই দক্ষ হওয়ার চেষ্টা করেছি।

তুসিন আহমেদ: ব্রেনস্টেশন নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

এম জে ফেরদৌস : ব্রেনস্টেশন বর্তমানে লোকাল মার্কেটের পাশাপাশি অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করছে। কোম্পানিটিতে এখন ২০০ কর্মী রয়েছে। আগামী ৫-৬ বছরের মধ্যে তা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। একদিন ভারতের ইনফোসিসের মতই বড় হবে সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি।

উদ্ভাবনী সব প্রযুক্তি নিয়ে ভবিষ্যতে কাজের পরিধি আরো বাড়ানো হবে। যার মধ্যে থাকবে মেশিন লার্নিং, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), মিক্স রিয়ালিটি (এমআর), আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সসহ (এআই) নিত্য নতুন প্রযুক্তি।

অনলাইন নির্ভরতা বাড়ার ফরে এখন আমরাও ক্লাউড ব্যবসার প্রতি নজর দিতে চাই। যা কোম্পানির আয়ের খাতকে স্থিতিশীল রাখবে।

তুসিন আহমেদ : নতুন উদ্যোক্তাদের প্রতি আপনার পরামর্শ?

এম জে ফেরদৌস : কোন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানালেই তা নিয়ে ব্যবসা করা যাবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। ব্যবসা করার আগে জানতে হবে প্রচলিত বাজার সম্পর্কে। তাই উদ্যোক্তাদের অবশ্যই ব্যবসায়িক ধারণা থাকা দরকার। উদ্যোক্তাদের যদি ব্যবসা সম্পর্কে ধারণা না থাকে তাহলে যে খাত নিয়ে কাজ করতে চায় এমন কোন কোম্পানিতে কিছুদিন চাকরি করলে ভালো হয়। তাহলে ব্যবসায়িক বাজারে সর্ম্পকে সঠিক ধারণা পাবে।

বন্ধুদের জানিয়ে দেন

আপনার মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here