মুহম্মদ জাফর ইকবাল নামটিই তাঁর পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট। জনপ্রিয় এই বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখক, পদার্থ বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বর্তমান ও এর ব্যবহার নিয়ে কথা বলেছেন টেকশহরডটকমের সঙ্গে। সাক্ষাতকার নিয়েছেন তুসিন আহমেদ।

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি উৎসব বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে আর সেখানে ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল আসবেন না তা কী করে হয়। রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরায় (আইসিসিবি) তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে আয়োজিত মহোৎসব ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার তিনি এসেছিলেন তিনি।

পরনে গাঢ় নীল শার্ট, হাতে ঘড়ি, চোখে চশমায় সানন্দে ঘুরছিলেন বিভিন্ন প্যাভিলয় ও স্টল। তাঁর সঙ্গে সেলফি তুলতে দর্শনার্থী ও অংশগ্রহণকারীর ভিড় লেগেই রয়েছে।

স্টল ঘুরতে ঘুরতেই টেকশহরের সঙ্গে আলাপ মুহম্মদ জাফর ইকবালের। তারপর মিডিয়া সেন্টারে এসে বসেন তিনি। সেখানে আরও বিস্তারিত আলাপ হয় দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বর্তমান অবস্থা ও প্রয়োগ,  শিশু-কিশোরদের প্রযুক্তি বিষয়ক পড়াশোনা, প্রোগ্রামিংসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে।

14786980_10206705241501520_2075512279_o

তুসিন আহমেদ : প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা চলাকালীন দেশে ফেইসবুক কয়েকদিন বন্ধ রাখা নিয়ে গণমাধ্যমের খবরে গুজব বা আলোচনা তৈরি হয়েছিল। তবে তেমন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি বলে পরে জানা যায়।  যদি এমনটা হতো তাহলে আপনি বিষয়টা কিভাবে দেখতেন?

মুহম্মদ জাফর ইকবাল: ফেইসবুক যদি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতো তাহলে আমার কোনো আপত্তি থাকতো না। কারণ ফেইসবুক আমাদের তরুণ সমাজের এত পরিমান সময় নষ্ট করেছে তা চিন্তার বাইরে। বাচ্চাদের জন্য আমি একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছি। সেখানে আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করে। সেখানে বাচ্চাদের আমি বলেই দিয়েছি তোমরা ফেইসবুকে সময় নষ্ট করবে না।

সেদিন আমি হলিক্রস স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়েছি সায়েন্স ফেয়ারে। সেখানে শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চেয়েছি, তোমরা কতজন ফেইসবুক ব্যবহার করো না? অনেক শিক্ষার্থী হাত তুলেছেন। ব্যাপারটি দেখে ভালো লেগেছে। তাদের স্কুল শিক্ষার্থীদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছে যে এখন ফেইসবুকে সময় নষ্ট না করে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে হবে। ফেইসবুক এক এমনটা জায়গা সেখানে নিজেকে দেখানো, প্রচার করো, লাইক ইত্যাদি করার জন্য সময় নষ্ট হয়।

তুসিন আহমেদ : তাহলে ফেইসবুক ব্যবহারের কোনো বয়সসীমা বা পরামর্শ রয়েছে কি?

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : হয়ত ফেইসবুক শিশু-কিশোররাও ব্যবহার করতে পারে তবে তা যেনো শুধু প্রয়োজনের ব্যবহার করা হয়। ফেইসবুক ব্যবহার করে যেনো লাইক, মন্তব্যের পিছনে মূল্যবান সময় নষ্ট না হয়। আমি এক বাচ্চাকে চিনি যার ফেইসবুকে ছবিতে কেউ লাইক দেয় না। তাই সে আরেকটা আইডি খুলে নিজের সেই ছবিতে নিজেই লাইক দিচ্ছে। কিন্তু কেনো এটি করতে হবে। এটি সময়ের অপচয়।

তুসিন আহমেদ: কেনো ফেইসবুকে ‘আসক্ত’ হচ্ছে তরুণরা ?

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : এই ফেইসবুক আসক্ত শুধু আমাদের দেশে নয়। সারা পৃথীবিতেই এটি একটি সমস্যা। মানুষ এখনো সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারছে না সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর খারাপ ও ভালো দিকগুলো সম্পর্কে। এর জন্য আমি সবাইকে বলি, “প্রযুক্তি ব্যবহার করো কিন্তু প্রযুক্তি যেনো তোমাকে ব্যবহার না করে।”

আমি ফেইসবুকের বসলাম কিন্তু উঠতে পারছি না। আমি জানি আমাকে হোমওয়ার্ক করতে হবে তবুও নেশা ছাড়তে পারছি না এই মাধ্যমটির। পড়া বাদ দিয়ে ফেইসবুকিং করছি। তখনই বুঝতে হবে ফেইসবুকের নেশায় আক্রান্ত হয়েছে গেছি আমি। এটি মাদকের মতই ভয়ংকর একটি নেশা।

zafor-iqbal-techshohor

তুসিন আহমেদ : ফেইসবুকের মত গেইম খেলায়ও শিশু-কিশোরদের নেশা হয়ে যায়। তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : আমার পরামর্শ হলো, শিশুদের গেইম খেলার উপকরণ না দিয়ে রং পেন্সিল,খাতা কলম, আর্ট পেপার দেয়া। এতে করে সে তার সৃজনশীলতাকে কাজে লাগতে পারবে। সুন্দর ছবি আঁকতে পারবে, কাগজ কেটে কেটে সুন্দর ডিজাইনে নৌকা বা প্লেন তৈরি করতে পারবে। গেইম খেলে সময় নষ্ট হবে এবং তা নেশায় পরিনত হলে বেশ খারাপ হবে। গেইম খেলা তখন উচিত যখন একজন বুঝতে পারবে যে নিজের সময়সূচী ও কাজ আলাদা করতে পারবে। যখন গেইম খেলা নেশার মত হবে না।

তুসিন আহমেদ : প্রোগ্রামিং, গনিত বা কম্পিউটারের টেকনিক্যাল বিষয়গুলো নিয়ে শিশু কিশোরদের ভয় কাজ করে। কেননা শিশুদের মত সহজ ভাষার বই খুব কম সংখ্যাকই আছে। শিশুর বোঝার উপযোগী এবং জটিল বিষয়গুলো সহজ করে আপনার কোন বই লেখার পরিকল্পনা আছে কি?

মুহাম্মদ জাফর ইকবাল: প্রোগ্রামিং বিষয়গুলো নিয়ে বাংলায় অনেক বই রয়েছে। আমার ছাত্র সুবিন (তামিম শাহরিয়ার সুবিন) প্রোগ্রামিং নিয়ে সুন্দর অনেক বই লিখেছে। এই বইগুলো পড়ে প্রোগ্রামিং ভাষা সম্পর্কে জানা যাবে। তাই আমি মনে করি প্রোগ্রামিং নিয়ে আমার বই না লিখলেও হবে। প্রোগ্রামিংটা আসলে ধরিয়ে দেয়ার ব্যাপার। তারপর শিক্ষার্থীরা নিজেদের মত করে এগিয়ে যাবে। সারা পৃথীবিতে অনেক রিসোর্স রয়েছে। একটু গুগল করলেই বিষয়গুলো সম্পর্কে জানা যাবে। উদারহণ হিসেবে বলা যায়, ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষর্থীদের সাথে প্রতিযোগিতা করে মেডেল নিয়ে এসেছে ক্লাস নাইনে পড়া দুইটি ছেলে।

তুসিন আহমেদ : এবার ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড কেমন লাগছে। এই আয়োজনে আরও কোন বিষয়গুলো যুক্ত হলে ভাল হতো বলে আপনার মনে হয়?

মুহম্মদ জাফর ইকবাল: এবার ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের আয়তন পূর্বের তুলনায় বেশ বড়। সবাই বেড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত জায়গা পাচ্ছে- ব্যাপারটি ভালো লেগেছে। তবে শুধুমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক এই আয়োজন হওয়ার কারণে ঢাকার বাইরে থাকা মানুষগুলো এই বড় আয়োজনটি দেখার সুযোগ পাচ্ছে না। যদি এই আয়োজনের সাথে ঢাকার বাহিরের মানুষগুলো যুক্ত করা যেতো তাহলে ভালো হতো। এক্ষেত্রে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের মতো আয়োজন যদি ছোট ছোট করে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে করা যায় তাহলে দেশের সবাই এই আয়োজন সম্পর্কে আরও জানতে পারতো।

তুসিন আহমেদ : ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডে অনেকগুলো স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে। দেশের স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে আপনার ভাবনা কি?

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : ব্যাপারটি ভালো লেগেছে অনেক উদ্যোগ দেখে। তবে সব উদ্যোগ যে সফলতার মুখ দেখবে তাও নয়। তাই বিভিন্ন উদ্যোগগুলো থাকতে হবে। চেষ্টা করে যেতে হবে। আমাদের উদ্যোক্তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বিনিয়োগ। বিনিয়োগের অভাবে অনেক উদ্যোগ এগিয়ে যেতে পারে না। এখন সম্প্রতি দেখছি ভেঞ্চার ক্যাপিটালসহ সরকার নানা ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ বা ফান্ড দিচ্ছে।

ইন্টারভিউ প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ২০১৬ সালে টেকশহর ডটকমে

বন্ধুদের জানিয়ে দেন

আপনার মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here