মিউজিক ডিভাইস হিসেবে আইপড ২০০১ সালের ২৩ অক্টোবর বাজারে আনে টেক জায়ান্ট অ্যাপল। মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে চমক করা ডিভাইস ছিলো এটি। এক নজরেই জনপ্রিয়তা পায় মিউজিক ভক্তদের কাছে। সর্বশেষ আইপডের নতুন সংস্করণ উন্মোচন করা হয় কয়েক বছর আগে। ২০১৭ সালের ২৭ জুলাই অ্যাপল ঘোষণা করেছে আইপড ন্যানো ও শাফল সিরিজের উৎপাদন বন্ধ করে দিবে। তাহলে কি ধীরে ধীরে আইপড‍ের উৎপাদন বন্ধ করে দিবে অ্যাপল। এমন নানা প্রশ্ন উঠছে প্রযুক্তি দুনিয়াতে। এই মিউজিক ডিভাইসের ইতিহাস ও বিস্তারিত তুলে ধরা।

নামকরণ

মূলত আইপডের সিরিজগুলো ক্লাসিক, মিনি, ন্যানো, শাফল এবং আইপড টাচ নামে নামকরণ করা হয়ে ছিলো। প্রতিটি সিরিজের বেশ কয়েকটি সংস্করণও ছিলো। সেগুলোকে প্রথম জেনারেশন, দ্বিতীয় জেনারেশন এরূপ নাম দেয়া হতো।

আইপড ক্লাসিক

প্রথম উন্মোচন করা সিরিজটিকে বলা হয় থাকে আইপড ক্লাসিক। ২০০১ সাল থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত এই সিরিজের ৬টি সংস্করণ এনেছিলো অ্যাপল। আইপড ক্লাসিকের প্রথম জেনারেশন ছিলো ৫ ও ১০ গিগাবাইট মেমোরি। যা টানা ১০ ঘণ্টা প্লেব্যাক সুবিধা দিতো। ২০০২ সালে ডিজাইনে একটু পরিবর্তন ১০ ও ২০ গিগাবাইট স্টোরেজ সমৃদ্ধ আইপড ক্লাসিকের দ্বিতীয় জেনারেশন বাজারে আসে।

২০০৩ সালে সম্পূর্ণ রি-ডিজাইন করে আইপড ক্লাসিকের তৃতীয় জেনারেশন উন্মোচন করা হয়। এটি ১০, ১৫, ২০, ৩০ এবং ৪০ গিগাবাইট ইন্টারনাল মেমোরি ৫টি সংস্করণে পাওয়া যেতো। তবে এতে প্লেব্যাক সুবিধা পূর্বের সংস্করণ থেকে ২ ঘণ্টা কমে পাওয়া যেতো ৮ ঘণ্টা।

পরবর্তীতে ২০০৪ সালে ক্লিক হুইল  নিয়ে আরও ছোট আকৃতির ডিজাইনে আসে আইপড ক্লাসিকের চতুর্থ জেনারেশন। এতে পাওয়া যেতো টানা ১২ ঘণ্টা প্লেব্যাক সুবিধা। জেনারেশনটি আরেকটি সংস্করণ একই সাথে উন্মোচন করেছিলো অ্যাপল। সেখানে রঙিন ছবি দেখার সুবিধা ছিলো। ৩০, ৪০ এবং ৬০ গিগাবাইট ইন্টারনাল মেমোরি পাওয়া যেতো এটি।

পাল্টে যাওয়া সময়ের সাথে তাল মিলাতে নতুন করে আবার ডিজাইন করে ভিডিও দেখার সুবিধা নিয়ে ২০০৫ সালে আসে আইপড ক্লাসিকের পঞ্চম জেনারেশন। এতে টানা ছয় ঘণ্টার মত ভিডিও দেখা ও ২০ ঘণ্টা অডিও শোনার সুবিধা ছিলো। এটি ৩০ ও ৬০ গিগাবাইট ইন্টারনাল মেমোরির দুইটি সংস্করণে পাওয়া যেত। ২০০৬ সালে নতুন কোন আইপড না এনে এটি ৮০ গিগাবাইট মেমোরির সংস্করণ উন্মোচন করা হয়েছিলো।

নতুন ইন্টারফেস, অ্যালুমিনিয়াম ফ্রন্ট প‍্যানেলযুক্ত আইপড ক্লাসিকের সর্বশেষ ডিভাইস বাজারে আসে ২০০৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বরে। ডিভাইসটি বাজারে ছিলো ২০১৪ সাল পর্যন্ত। এটি ৮০, ১২০, ১৬০ গিগাবাইট ইন্টারনাল মেমোরিতে পাওয়া যেতো। এতে ৪০ ঘণ্টা অডিও ও ৭ ঘণ্টা ভিডিও প্লেব‍্যক সুবিধা ছিলো।


আইপড মিনি

আইপড ক্লাসিক থেকে ছোট আকৃতির আইপড মিনির দুইটি সংস্করণ বাজারে এনেছিলো অ্যাপল ২০০৪ ও ২০০৫ সালে। সাধারণত আইপডগুলো রঙ সাদা বা সিলভার রঙের হলেও বিভিন্ন রঙে মিলতো আইপড মিনি। এই ডিভাইসটিতেই প্রথমবারে মত ব্যবহার করা ক্লিক হুইল প্রযুক্তি। ফলে আইপডে থাকা গোলাকার বাটনে ক্লিক না করে তা ঘুরিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যেত গান।  প্রথম জেনারেশন আইপড মিনিতে ছিল ৪ গিগাবাইট মেমোরি এবং ৮ ঘণ্টা প্লেব্যাক সুবিধা। দ্বিতীয় জেনারেশন আইপড মিনিতে ছিল ৪ ও ৬ গিগাবাইট মেমোরি এবং ১৮ ঘণ্টা প্লেব্যাক সুবিধা ছিল।


আইপড ন্যানো

মঞ্চে স্টিভ জবস দাঁড়িয়ে আছেন, পরনে সেই চিরচেনা জিন্স প্যান্ট এবং টিশার্ট। জবসের প্যান্টের পকেট দিকে তাক করা ক্যামেরা। তিনি বলেন, প্যান্টের বড় পকেটের উপরে থাকা ছোট পকেটের দিকে তাকালে আমরা কষ্ট লাগে। বড় পকেটে ফোন থাকে কিন্তু ছোট পকেটে কিছু থাকে না

হল জুড়ে থাকা দর্শকরা অপেক্ষা করছেন, হয়ত নতুন চমক দিবে স্টিভ জবস। তাই করলেন অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছোট পকেটে হাত দিয়ে বের করলেন আইপড ন্যানো এর প্রথম সংস্করণ। সে সময়টা ছিল ৭ সেপ্টেম্বর ২০০৫ সাল।

প্রথম আইপড ন্যানো বাজারে আসে ১, ২ এবং ৪ গিগাবাইট স্টোরেজ সংস্করণ এবং সাদা ও কালো রঙে। স্ক্রিন ছিল মাত্র ১.৫ ইঞ্চি। মূল্য ছিল ১৪৯ মার্কিন ডলার।

এরপর ২০১২ সাল পর্যন্ত ৭টি আইপড ন্যানো সিরিজের ডিভাইস আনে অ্যাপল। মূলত আকৃতি ছোট হওয়ার কারণে জনপ্রিয়তা পায় এই মিউজিক ডিভাইসগুলো। প্রথম জেনারেশন থেকে শুরু করে পঞ্চম জেনারেশনে আইপড ন্যানোর ডিজাইন প্রায় একই রকম ছিল। ২০১০ সালে ৬ জেনারেশনের আইপড মিনিতে মাল্টি-টাচ সুবিধা যুক্ত করা হয়। সেখানে ছিল না স্পিকার, ক্যামেরা এবং ভিডিও প্লেব্যাক সুবিধা। অনেকটা স্মার্টঘড়ি মতই দেখতে ছিল ডিভাইসটি আকৃতি। সেই সময় বাজারে ডিভাইসটির জন্য ঘড়ির মতই স্ট্যাপ পাওয়া যেতো। অনেকে ঘড়ির মতই ব্যবহার করতে করত মিউজিক ডিভাইসটিকে। 

আইপড শাফল

২০০৫ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৪টি আইপড শাফল ডিভাইসের সাথে মিউজিক প্রেমীদের পরিচয় করিয়ে দেয়া অ্যাপল। এই সিরিজের ডিভাইসগুলোতে কোন ডিসপ্লে ছিল না। ফলে ব্যবহারকারীরা পরবর্তীতে কোন গানটি শুনবেন তা নির্ধারণ করতে পারতো না। অনেকটা অন্ধের মত ডিসপ্লে ছাড়াই ব্যবহার করতে হতো ডিভাইসটি। এই সিরিজটির প্রথম ও তৃতীয় জেনারেশনের আকৃতির ছিল লম্বাটে। দ্বিতীয় ও চতুর্থ জেনারেশনের আকৃতি ছিল ছোট ও স্কয়ার সাইজের।

আইপড টাচ

আইপড টাচকে বলা হয়ে থাকে সিম ছাড়া আইফোন। ডিজাইন এবং সুবিধা আইফোনের মত হলেও এতে ছিল সিম কার্ড ব্যবহারের সুবিধা। ২০০৭ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এই সিরিজের ৬টি ডিভাইস বাজারে এনেছিল অ্যাপল।

২০০৭ সালে বাজারে আনা প্রথম জেনারেশন আইপড টাচের ছিল ৩.৫ ইঞ্চি মাল্টি-টাচ ডিসপ্লে, ওয়াইফাই, অ‍্যাপ স্টোর , সাফারি ব্রাউজার, আইটিউনস সুবিধা। বিশেষ করে কিছুটা কমদামে আইফোনের প্রায় সব সুবিধা পাওয়া কারণে বেশ জনপ্রিয়তা পায় সিরিজটি।

সর্বশেষ ৬ জেনারেশন আইপড টাচে বাজারে আনা হয়েছিলো ১৫ জুলাই ২০১৫ সালে। ৪ ইঞ্চি ডিসপ্লে ও ৬ টি রঙে বাজারে বিক্রি হয়েছিলো ডিভাইসটি। এতে ব্যবহার করা হয়েছিলো এ৮ প্রসেসর এবং রয়েছে ১ গিগাবাইট র‍্যাম। এছাড়া ওয়াইফাই,ব্লটুথ ইত‍্যাদি সুবিধা তো ছিলই।

চলতি মাসে অ্যাপলের পণ্য উন্মোচন অনুষ্ঠানে ধারণা করা হয়েছিলো নতুন আইপড টাচের ঘোষণা দিতে পারে অ্যাপল। এই নিয়ে বেশ কয়েকমাস আগে থেকেই চলছিলো নানা গুঞ্জন। কিন্তু আইপড ভক্তদের হতাশ করে নতুন কোন আইপড সংস্করণের ঘোষণা দেয়নি অ্যাপল।

বিদায় ন্যানো ও শাফল

স্মার্টফোনের সাথে বাজারে পাল্লা দিয়ে আইপড ন্যানো ও শাফল জনপ্রিয়তা হারিয়েছে। তাই চলতি বছর আইপডের এই দুইটি সিরিজকে বিদায় জানানোর কথা জানিয়েছে অ্যাপল।  দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপল এ দুটি যন্ত্রের কোনো হালনাগাদও করেনি। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের স্ট্রিমিং সেবা অ্যাপল মিউজিক চলে না এতে।শাফল উন্মোচন করা হয় তখন এটি একটি উদ্ভাবনী পণ্য ছিল। কিন্তু এতে পর্দা না রাখায় এ নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। একই বছর আইপড মিনির পরিবর্তে ন্যানো উন্মোচন করা হয়। এতে আবার পর্দা ফিরিয়ে আনে অ্যাপল। সব মিলিয়ে আইপডের পুরনো দুটি সিরিজকে আবার বাজারে দেখা যাবে না।

 

বন্ধুদের জানিয়ে দেন

আপনার মতামত জানান

Please enter your comment!
Please enter your name here