বছর দশেক আগে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ালেখার সময়ই বিয়ে হয়ে যায় নিশা জাহানের। সংসারের চাপে আর পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনি। একদিন ফেইসবুকের হোম পেইজে খোঁজ পান সার্চ ইংলিশ গ্রুপের। সদস্য হয়ে নিয়মিত ইংরেজি শিখতে শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ইংরেজি বই পড়ার পাশাপাশি সঠিক উচ্চারণসহ ইংরেজিতে কথাও বলতে পারেন। শুধু তা-ই নয়, নতুন করে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে পড়াশোনাও শুরু করেছেন। শুধু নিশা নয়, এমন অনেকেই এই প্ল্যাটফর্মে ইংরেজি শিখেছেন। এই প্ল্যাটফর্মের জন্যই গ্রুপটির উদ্যোক্তা রাজীব আহমেদ পেলেন ফেইসবুকের সম্মাননা।

প্রথমবারের মতো ‘কমিউনিটি লিডারশিপ’-এর তালিকা করেছে ফেইসবুক। তালিকায় আছেন বাংলাদেশের রাজীব আহমেদ। ‘সার্চ ইংলিশ’ নামে একটি গ্রুপে ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে অবদান রাখায় তাঁর এ অর্জন। গ্রুপটির বর্তমান সদস্যসংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ। এই গ্রুপ ও সার্চ ইংলিশ সম্পর্কে জানতে গিয়েছিলাম রাজিব ভাইয়ের অফিসে। বিস্তারিত…

ফেইসবুকের কমিউনিটি লিডারশিপ প্রগ্রাম

বন্ধুদের পাশাপাশি অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগের সুযোগ দিতে ফেইসবুক পেইজের পাশাপাশি রয়েছে গ্রুপ ফিচার। একই প্ল্যাটফর্মের আওতায় নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ পাওয়া যায় গ্রুপগুলোতে। এই কমিউনিটিকে আরো এগিয়ে নিতেই কাজ করে চলছে ফেইসবুকের কমিউনিটি লিডারশিপ প্রগ্রাম। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যেই মূলত প্রগ্রামটি চালু করা হয়।

গত ফেব্রুয়ারিতে ফেইসবুক কমিউনিটি লিডার প্রগ্রাম শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর অনলাইনে সারা বিশ্ব থেকে প্রায় ছয় হাজার আবেদন জমা পড়ে। সেখান থেকে বাছাই করে ‘রেসিডেন্স’, ‘ফেলো’, ‘ইয়ুথ’—এই তিন বিভাগে ৪৬টি দেশের ১১৫ জনকে কমিউনিটি লিডার নির্বাচন করে ফেইসবুক। সম্মানজনক এ তালিকায় ‘ফেলো’ হয়েছেন সার্চ ইংলিশের রাজীব আহমেদ।

ফেইসবুকের কমিউনিটি লিডার হিসেবে ৫০ হাজার ডলার বা প্রায় ৪১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পুরস্কার পাবেন সার্চ ইংলিশের প্রতিষ্ঠাতা ও ই-কমার্স সংগঠন ই-ক্যাবের সাবেক সভাপতি রাজীব আহমেদ। ফেইসবুকের প্রধান কার্যালয়েও যাবেন তিনি।

সার্চ ইংলিশের জন্মকথা

‘ইংরেজিতে ভীতি আমাদের অনেকেরই। স্কুল-কলেজের অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজি বিষয়ের পরীক্ষায় খারাপ ফল করে। একই কারণে চাকরির ক্ষেত্রেও ঝামেলায় পড়েন অনেকে। ভাষা নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হয় বিদেশে কাজ বা ভ্রমণের সময়। পড়ালেখার পাট চুকিয়ে ফেলা ব্যক্তিরা এ সমস্যার মুখোমুখি হলেও লজ্জায় ইংরেজি অনুশীলন করেন না। এসব মানুষকে সাহায্য করার লক্ষ্য নিয়েই সার্চ ইংলিশের জন্ম।’ শুরুর কারণটা এভাবেই ব্যাখ্যা করলেন রাজীব আহমেদ।

জানালেন, ২০১৬ সালের জুলাইয়ের প্রথম দিন থেকে সার্চ ইংলিশের যাত্রা শুরু। ফেইসবুক গ্রুপের মাধ্যমে ইংরেজি শেখানোর এই উদ্যোগ জনপ্রিয়তা পায় দ্রুত। এক বছরের মাথায় ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায় গ্রুপের সদস্যসংখ্যা। বর্তমানে গ্রুপটির সদস্যসংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ। এর মধ্যে চার লাখ প্রবাসীও রয়েছেন। বাংলাদেশির পাশাপাশি গ্রুপটির অনেক সদস্য রয়েছেন ভারতেও।

রাজীব আহমেদ বলেন, ‘অনেকেই ইংরেজি কম জানার কারণে অন্যদের সামনে ইংরেজি বলতে ও অনুশীলন করতে ভয় বা লজ্জা পায়। আমাদের গ্রুপে এ ধরনের ভয় পেতে হয় না। আমরা সবাই একে অপরের ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে সঠিকটি শিখিয়ে দিই। ফেইসবুক গ্রুপের মাধ্যমে ইংরেজি শেখার উদ্যোগ দ্রুত জনপ্রিয়তা পাওয়ার এটাই প্রধান কারণ।’

প্রশিক্ষণটি গতানুগতিক নয়

সার্চ ইংলিশ প্ল্যাটফর্মে সবাই ইংরেজি শিখতে পারেন। তবে ইংরেজি শেখার গতানুগতিক কোচিং সেন্টার থেকে গ্রুপটির কার্যক্রম একেবারেই আলাদা। দেশ-বিদেশের যেকোনো ব্যক্তি গ্রুপটিতে যুক্ত হয়ে বিনা মূল্যে ইংরেজি শিখতে পারেন। ইংরেজিতে লেখা আর্টিকল পড়ারও সুযোগ রয়েছে। সদস্যদের ইংরেজিতে কথা বলা, লেখা ও শোনার দক্ষতা বাড়াতে বিভিন্ন কনটেন্টও প্রকাশ করা হয়। বেশ কিছু পেইড অনলাইন লাইভ ক্লাসও রয়েছে গ্রুপটিতে। সার্চ ইংলিশের ওয়েবসাইটে ঢু মারলেই জানা যাবে খুঁটিনাটি তথ্য।

সঙ্গে আছেন আরো তিনজন

সার্চ ইংলিশের প্রধান উদ্যোক্তা রাজীব আহমেদ। তবে তিনি একা নন। সঙ্গে রয়েছেন নেয়ামত উল্যাহ মহান ও আবুল খায়ের। কারিগরি বিষয় দেখভাল করেন তাঁরা। এ ছাড়া সার্চ ইংলিশের নানা বিষয়ে গবেষণার কাজ করেন এস এম মেহেদী হাসান।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

শুরু থেকেই ইচ্ছা ছিল—ঢাকার বাইরের জেলা, উপজেলা ও গ্রামপর্যায়ের মানুষের কাছে ইংরেজি ভাষা অনুশীলনের একটি প্ল্যাটফর্ম পৌঁছানো। লক্ষ্য পূরণের পর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান দিয়ে রাজীব আহমেদ বলেন, ‘কেন আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি পরীক্ষায় খারাপ করে, তা নিয়ে ভবিষ্যতে আরো গবেষণা করার ইচ্ছা আছে। সে অনুযায়ী সার্চ ইংলিশে শেখানো পদ্ধতির আরো উন্নয়ন করা হবে। ফেইসবুকের এই প্রগ্রামে নির্বাচিত হওয়ার ফলে আমাদের এই কাজ আরো একধাপ এগিয়ে গেল।

আরো অর্জন আছে সার্চ ইংলিশের

নিশা জাহানের বদলে যাওয়া জীবনের মতো সার্চ ইংলিশের ছোট ছোট সাফল্যগাথা নিয়ে গত বছরের অক্টোবরে ফেইসবুকের বিজনেস পেইজে ফিচার ও ভিডিও ডকুমেন্টারি প্রকাশ করা হয়। এই ঠিকানায় ঢু মারলেই দেখা যাবে ফিচার ও ভিডিও ডকুমেন্টারিটি।

পাশাপাশি চলতি বছরের মে মাসে ‘সোশ্যাল মিডিয়া ফর এম্পাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ২০১৮’-এর কমিউনিটি মোবিলাইজেশন বিভাগে পুরস্কার জিতেছে সার্চ ইংলিশ। জিপি অ্যাক্সেলেটরের পঞ্চম ব্যাচের গ্র্যাজুয়েট স্টার্টআপের স্বীকৃতি পাওয়ার পাশাপাশি স্টার্টআপ বাংলাদেশ প্রকল্প থেকে ফান্ডও পেয়েছে।

৩ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত এমবিলিয়নথ এশিয়া অ্যাওয়ার্ড ২০১৮তে লার্নিং অ্যান্ড এডুকেশন ক্যাটাগরিতে সার্চ ইংলিশ মনোনয়ন লাভ করেছে।

ছিল প্রতিকূলতাও

ফেইসবুক গ্রুপ খুলে ইংরেজি শেখাতে শুরুর সময় অনেকেই রাজীব আহমেদকে নিয়ে হাসি-তামাশা করত। ভুলভাবে মানুষকে গাইড করা হচ্ছে বলত অনেকে। ‘ধান্দাবাজি হচ্ছে’—বলতেও ছাড়েনি কেউ কেউ। তবে বিষয়গুলো কানে তোলেননি রাজীব আহমেদ। তিনি বলেন, ‘একটা সৎকাজ করছি, সেটি আমি জানি এবং আমার কাজে কারো ক্ষতি হচ্ছে না। তাই কে কী বলল তা নিয়ে আমি ভাবিনি, সামনে এগিয়ে গিয়েছি।’

একনজরে রাজীব আহমেদ

নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা করেন রাজীব আহমেদ। পেশা হিসেবে বেছে নেন শিক্ষকতা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন প্রায় তিন বছর। এরপর ২০০২ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে অনলাইনভিত্তিক কাজ করা শুরু করেন। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সার লেখক হিসেবে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রযুক্তিসহ নানা বিষয়ে লিখতেন।

২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক একটি ব্লগ মিডিয়ায় প্রফেশনাল লেখক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর ই-কমার্স সংগঠন ই-ক্যাবের সভাপতি হিসেবে অনলাইনে কেনাকাটার খাতটি জনপ্রিয় করার পাশাপাশি উন্নয়নে নেতৃত্ব দেন। বর্তমানে তাঁর ধ্যান-জ্ঞান সার্চ ইংলিশ নিয়েই।

বন্ধুদের জানিয়ে দেন
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments